জুলাই আন্দোলনের দেনা পাওনার মূল্যায়ন নিয়ে ডাকসু নেত্রী উম্মে সালমা বলেছেন, দুই বছর পর আমাকে মূল্যায়ন করতে বললে, বলবো আমি হতাশ হয়েছি। আমি আন্দোলনে যুক্ত হই ২০২৪ইং এর ২ জুলাই। প্রথম জুলাই আমি লাইব্রেরিতে এসে দেখি অনেক ছেলের মধ্যে এক দু’জন মেয়ে। একারণে আমি যুক্ত হইনি। লাইব্রেরির উল্টোপাশে যে খাবারের দোকান আছে সেখান থেকে কিছুক্ষণ দেখেই চলে আসি। দুই জুলাই আন্দোলনে যাই অনেক মেয়েকে নিয়ে। আমার সাথে অনেক মেয়ে ফ্রেন্ড ছিল। পরবর্তীতে আমরা খেয়াল করলাম যে আমরা হল থেকে আসবো। সুফিয়া কামাল হলে আমি রিফাত রশিদ ভাই এবং সমন্বয়কদের সাথে যোগাযোগ করে আমাদের ব্যানার করি। আমাদের হল থেকে আমরা আন্দোলনে আসি। এভাবেই হল থেকে আমাদের আসা শুরু হলো। ৫ তারিখে এসে চিন্তা করলাম আমরা যদি হল থেকে আসি; তাহলে তো হলের সবাইকে তো চিনি না। আমরা ডিপার্টমেন্ট থেকে আসার চিন্তা করি কারণ ডিপার্টমেন্টে সবাই সবাইকে চিনি। আমি ডিপার্টমেন্টে কথা শুরু করি এবং বলি যে আমরাতো ডিপার্টমেন্ট থেকে আসতে পারি। এরপর থেকে আমরা ডিপার্টমেন্টের ব্যানারে আসা শুরু করি। হল এবং ডিপার্টমেন্ট দুই জায়গা থেকেই আমি প্রথম থেকে আন্দোলনে যুক্ত হই। নীতি নির্ধারক পর্যায়ে মেয়েদের উপস্থিতিতে আমি ছিলাম। নূসরাত আপাসহ আমরা ৫টা হলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটা গ্রুপে ছিলাম।
যা হউক জুলাই যেদিন শেষ হলো ৫ আগস্ট, এদিনের পর থেকে আসলে এখানে পলিটিক্স চলে এসেছে। সবাই যেদিন মার খেলাম ১৫ই আগস্ট সেদিন থেকেই ডিপ্রেসড ছিলাম। আমার বাসা ছিল লালবাগে। আমি আমার বাসা থেকে কোথাও যাইনি। হল থেকে অনেকে বাড়ি চলে গেছে। এসময়েও হলের কিছু আপুরা সরাসরি বাড়ি যেতে পারছিল না পথে অনেক কিছু হতে পারে সেই ভয়ে। ওরা আমার বাসায় ছিল। এই আমাদের একজন আরেকজনের বিপদে এগিয়ে আসার একটা সময় ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর আর এটা দেখিনি। ৫ আগস্টের পর দেখবেন সমন্বয়কদের নিয়ে টিএসসিতে কিছু প্রোগ্রাম হয়েছে। আমি নাহিদ এবং সারজিস ভাইদের সাথে শুরু থেকে মিটিংগুলোতে ছিলাম। অনলাইনের একটা মিটিংয়ে নাহিদভাই বলছিলেন, এই আন্দোলনটা ততদিন এক্সিসড করবে যতদিন না আন্দোলন সফল হবে। সফল হবে মানে আমাদের দাবি দাওয়াগুলো মেনে নিবে। সে হিসেবে ৫ আগস্টের পর আর বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন নামের কোন সংগঠন থাকার কথা ছিল না। কিন্তু তারা রেখে দিয়েছে।
আমি যদি বলি সমন্বয়ক যারা ছিল তারা আন্দোলনের পরে বাড়ি চলে গিয়েছিল। তাদেরকে নিয়ে ড. ইউনূসকে রিসিভ করতে গেছে অনেকে। এই যে এই জিনিসগুলো হয়েছে, আমি মনে করি ৫ আগস্টে যে সফলতা এসেছিল; ৫ আগস্টের পর আর ধরে রাখতে পারেনি। সেই সফলতাটা দলীয়করণের দিকে গিয়ে পুরো জুলাইটাকেই নষ্ট করে দিয়েছে। ২৫ সালে যখন অন্তবর্তী সরকার ছিল; তখনো আমি মনে করেছি যে জুলাই অনেকটা আমাদের হাতেই আছে। যতই জুলাইকে বেহাত করার চেষ্টা করুক না কেন, আন্দোলনতো শুধু তাদের ছিল না; সমন্বয়কদের ছিল না। আন্দোলনটা গণমানুষের মধ্যে চলে গিয়েছিল। সাধারণ মানুষ, কুলি মজুর থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা পর্যন্ত চলে আসছিল। তাহলে এই আন্দোলনকে কেউ পকেটভর্তি করতে চাইলেও অতটা সম্ভব না বলে মনে করি।
২৫ সালে কিন্তু জুলাইয়ের দিবসগুলোকে যেভাবে পালন করলো ২৬ সালে এসে জুলাই মাসে ‘উইমেন ডে’ টা পালন করা হলো না। বিশ্ববিদ্যালয় নাকি জানেই না। আমরা ডাকসু থেকে বলেছিলাম। তাদের কাছে বলেছিলাম এমন একটা দিবস আমরা পালন করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যার বললেন উনি নাকি জানেন-ই না যে ১৪ তারিখ ‘জুলাই কন্যা দিবস’। একথায় খুবই হতাশ হয়েছি। এরপর ১৫ তারিখ আমাদের সাথে বসেছে। ততক্ষণেতো ১৪ তারিখ চলে গেছে। আমরা বললাম যে তাহলে আপনারা এই বিষয়টাকে ক্যালেন্ডারভূক্ত করেন যাতে ভবিষতে কেউ না বলতে পারে যে, আমরা এটা জানি না।
আর ১৭ তারিখ একটা প্রতিরোধ দিবস। ওরাতো নির্যাতন করেছিল। এরপর তারা হল থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এটা পালন করার জন্য ডাকসু থেকে দাবি জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয় আবার হতাশ করে। তারা যখন বিবৃতি দিয়েছে তখন জুলাই কন্যা দিবসকে রাখলেও ১৭ তারিখ প্রতিরোধ দিবসকে এড়িয়ে গেছে। আমরা বলেছিলমা আমাদের ওপর যে হামলাটা হয়েছিল তার ইন্ধন দাতা ফ্যাসিবাদী শিক্ষকরা। আপনারা তাদের শাস্তি দেন। যাতে ভবিষ্যতে এরকমটা আর না হয়। সেদিন আমরা ছেলে মেয়ে সবাই হামলার শিকার হয়েছি। এর বিচার হলে ভবিষ্যতে ছাত্রলীগের মতো আর কেউ তৈরি হতে পারবে না। মনে হলো তারা চায় ভবিষ্যতে অন্য কেউ ছাত্রলীগের মতো আচরণ করুক। আমার ভয় হয় যে তারা এক সময় পুরো জুলাইকে অস্বীকার করতে পারে।
জুলাই থেকে কি শিক্ষা নেওয়া যায় এমন প্রশ্নে ডাকসুর এই নেত্রী জানালেন, ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। আমার মনে হয় তারা হাসিনার পতন দেখার পরও এরা সবাই হাসিনার মতো হতে চায়। আমি কয়েকজন ভিসিকে দেখেছি। এরমধ্যে ড. নিয়াজ জুলাইকে যথেষ্ট ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পর সবকিছু আবার দলীয় করণের দিকে যাচ্ছে। এরকম হলেতো কিছুই পরিবর্তন হলো না। ভার্সিটিসহ সরকারের অন্যান্য অর্গানগুলোতেও দলীয়করণ হচ্ছে। নিয়মবহির্ভূত ভাবে প্রশাসক বসানো হচ্ছে। একাজটাতো আওয়ামী লীগ করতো। আওয়ামী লীগ তা করেছে বলেই তাদের পতন হয়েছে। তারাও যদি একইকাজ করলো তাহলে আমাদের জুলাইটা আসছিল কেন ? তাহলো এত মানুষ মারা গেলো কেন ? এতগুলো মানুষ আহত অঙ্গহানি হলো কেন? একারণে আমি হতাশ। জুলাইয়ে যখন আমরা মেয়েরা অংশ নিতাম তখন ৫০ থেকে ১০০ জনের মতো মেয়ে ছিলাম। এখন যদি ডাকেন, তাহলে প্রথমত আমরা বিভক্ত হয়ে গেছি। দ্বিতীয় কথা হলো যে আমরা প্রপার সম্মান পাইনি। তারপরও যদি ডাকেন, দুই-তিন জনের বেশি হবে না। এরকম হলো কেন ? আমরা এখনো একটা পাবলিক পোস্ট দিতে পারি না। গালির বন্যা বয়ে যায়। কোন ছাত্রলীগকে ধরা হয় না। যাদের ধরা হয় তাদের ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এই যে তারা শাস্তি পাচ্ছে না। তাতে তো দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছে। তারা কেবল আমাকে না আমার পরিবারকেসহ হয়রানি করে। এসব নিয়েতো টিকে থাকা কঠিন।
আগামী ২৭ সালে আপনি কিভাবে জুলাইকে দেখতে চান এমন প্রশ্নে উম্মে সালমা বলেন, ২০২৪ সালে যেরকম জুলাইকে দেখেছি সেরকম করে দেখতে চাই। আমি জানি যে এটা সম্ভব হবে না। দেশকে নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী এবং সেই সাথে হতাশ। আমার ২৪ সালে যে স্বপ্ন ছিল আগামী ২৭ সালেও একইরকম স্বপ্ন। কিন্তু আমাদের দেশে যে-ই সরকারে যায় সে-ই হাসিনা হতে চায়। এখনো চাই বিএনপি তাদের ভুলগুলো শুধরে মানুষ যেভাবে চায় সেভাবে সরকারকে চালাবে।