“আমরা খুনি হাসিনা ও তার দোসরদের বিচারের শুধু অর্নামেন্টাল (লোক-দেখানো) রায় ঘোষণা নয়, বরং তার যথাযথ বাস্তবায়ন দেখতে চাই” বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে শহীদদের গণকবর জিয়ারত শেষে উপস্থিত সাংবাদিক ও নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, “২০২৪ সালের ১৬ জুলাই শহীদ আবু সাঈদকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণহত্যার সূচনা করেছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ও তার দোসররা। সেদিন থেকে শুরু হওয়া এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন বাহিনীগুলোকে ব্যবহার করে অসংখ্য লাশ গোপনে এই রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল। আমরা এই জঘন্য বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানাই।”
তিনি আরও বলেন, “এই গণহত্যায় প্রায় সাড়ে ১৪শ-এর বেশি মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও, এখন পর্যন্ত ৮শ-এর কিছু বেশি লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে যাদের কবরস্থ করা হয়েছে এবং যারা জনগণের ওপর এই বর্বরতা চালিয়েছে, তাদের বিচার অতি দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে।”
বর্তমান বিচার প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে নূরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, “যারা গ্রেফতার হয়েছে, তাদের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো রায় আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বিপরীতে, যারা পালিয়ে গেছে এবং যাদের রায় এই মুহূর্তে কার্যকর করা সম্ভব নয়, কেবল এমন কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধেই অর্নামেন্টাল রায় প্রদান করা হয়েছে। এগুলো জাতির সাথে সুস্পষ্ট প্রতারণার শামিল।”
তিনি আরো বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা খুনি হাসিনাকে যারা সহযোগিতা করেছিল, তাদের অনেকেই এখন কারাগারে বন্দি। আমরা তাদের রায় দ্রুত দেখতে চাই এবং কেবল রায় ঘোষণা নয়, আমরা তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখতে চাই।” গণহত্যার বিচারের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নেরও দাবি জানান তিনি।
শহীদদের গণকবর জিয়ারত ও দোয়া মাহফিলে ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন শাখার নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এ সময় শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত ও তার পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর কবর জিয়ারত করেছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম।
গতকাল বৃহস্পতিবার পীরগঞ্জের বাবনপুর গ্রামে শহীদ আবু সাঈদের নিজ বাসভবন সংলগ্ন কবরস্থানে জিয়ারত সম্পন্ন করেন তিনি। কবর জিয়ারতকালে উপস্থিত ছিলেন রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা নূরুল আমীন, বিশিষ্ট ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ, সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ ডা. এস এম খালিদুজ্জামান এবং ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় ছাত্রকল্যাণ সম্পাদক রেজাউল করিম শাকিলসহ রংপুর অঞ্চলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
জিয়ারত শেষে কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম শহীদ আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি শহীদের পিতা-মাতা ও ভাইদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন। এ সময় তিনি আবু সাঈদের আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন, পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং সবসময় তাঁদের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এছাড়াও তিনি শহীদ আবু সাঈদ ফাউন্ডেশন পরিদর্শন করেন।
এ সময় শিবির সভাপতি বলেন, “শহীদ আবু সাঈদের অকুতোভয় আত্মত্যাগ এ জাতির সংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। তাঁর শাহাদাতের মধ্য দিয়েই এ জাতির বিবেক জাগ্রত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। তাঁর এই বীরত্বগাথা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।”
তিনি আরও বলেন, “শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাই অভ্যুত্থানের সকল শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত বর্বরোচিত হামলা ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আমরা প্রশাসনের কাছে আবু সাঈদ, আলী রায়হান, মুগ্ধ, শান্ত ও ওয়াসিমসহ সকল শহীদ হত্যার বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছি। এছাড়াও তিনি জুলাই যোদ্ধা শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যার বিচার দাবি করেন।
জুলাই শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মানে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়ে কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, “শহীদরা আমাদের জাতীয় সম্পদ। তাঁরা বৈষম্যহীন, ইনসাফভিত্তিক ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন নিয়ে আত্মত্যাগ করেছেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ছাত্রশিবির সবসময় কাজ করে যাবে। সকলের জন্য ন্যায়, সাম্য ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”