গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভায় নাগরিক সেবা সহজীকরণ ও রাজস্ব আদায়ের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে এবি ব্যাংক পিএলসির একটি উপ-শাখা (কালেকশন বুথ) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘদিনেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন, নীতিগত সম্মতি এবং অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার পরও উদ্যোগটি আলোর মুখ না দেখায় একটি স্বার্থান্বেষী মহলের বাধার অভিযোগ উঠেছে।

দেশের অধিকাংশ ‘ক’ ও ‘খ’ শ্রেণির পৌরসভায় সরকারি রাজস্ব আদায় ও নাগরিক সেবা সহজ করতে বেসরকারি ব্যাংকের শাখা বা উপ-শাখা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অথচ ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভা হওয়া সত্ত্বেও শ্রীপুর পৌরসভায় এখনো কোনো ব্যাংকের শাখা বা কালেকশন বুথ না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি এবি ব্যাংক পিএলসি শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পৌরসভা কার্যালয়ে একটি কালেকশন বুথ স্থাপনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বুথটির মাধ্যমে পৌরকর, ট্রেড লাইসেন্স ফি, বিভিন্ন সরকারি ফি, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের বিলসহ সরকারি বিভিন্ন পাওনা আদায় করা হবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সকল বিধি-বিধান অনুসরণ করে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীপুর পৌরসভার তৎকালীন প্রশাসক ব্যারিস্টার সজীব আহমেদের স্বাক্ষরিত এক পত্রে নীতিগতভাবে উপ-শাখা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

পরবর্তীতে ৩১ মার্চ পৌরসভা কর্তৃপক্ষ এবি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের খুচরা ব্যাংকিং বিভাগের প্রধানের কাছে পৃথক চিঠি পাঠিয়ে জানায়, পৌর ভবনের নিচতলায় প্রায় ১২০ বর্গফুট জায়গা উপ-শাখার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ জায়গার জন্য কোনো ভাড়া বা অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য স্থান ব্যবহারের সুযোগ থাকবে এবং সেবার মান সন্তোষজনক হলে পরবর্তীতে চুক্তির মেয়াদ নবায়ন করা হবে।

পৌরসভার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কালেকশন বুথটি চালু হলে নাগরিকরা একই স্থানে পৌরকর, ট্রেড লাইসেন্স ফি, বিভিন্ন সরকারি ফি এবং বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের বিল পরিশোধ করতে পারবেন। এতে নাগরিকদের সময় ও ভোগান্তি কমার পাশাপাশি সরকারি রাজস্ব আদায় হবে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর।

শ্রীপুর পৌরসভার ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের রাজস্ব হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ২০ কোটি ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭৫ টাকা ২৪ পয়সা। এর মধ্যে গৃহ ও ভূমি কর থেকে ৭ কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজার ২৭৩ টাকা, স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর ফি থেকে ৬ কোটি ১৩ লাখ ৪৭ হাজার ৭০৬ টাকা ৯৮ পয়সা, বিভিন্ন অনাপত্তি সনদ থেকে ৩ কোটি ২৭ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা, পেশা, ব্যবসা ও কলিং কর থেকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৯ হাজার ১৯৭ টাকা এবং পানি সরবরাহ খাত থেকে ১ কোটি ৩ লাখ ৯১ হাজার ৮৫ টাকা আদায় হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিপুল পরিমাণ এই রাজস্ব আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হলে আদায় কার্যক্রম আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে।

তবে একাধিক সূত্রের দাবি, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও উপ-শাখাটি চালু না হওয়ার পেছনে একটি প্রভাবশালী মহল সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন আপত্তি ও অযৌক্তিক জটিলতা সৃষ্টি করে উদ্যোগটি বিলম্বিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে পৌরসভার ব্যবসায়ী, সেবাগ্রহীতা ও সচেতন নাগরিকরা বলেন, পৌরসভা কার্যালয়ে একটি ব্যাংকিং কালেকশন বুথ চালু হলে শুধু রাজস্ব আদায়ই সহজ হবে না; ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, প্রবাসী পরিবারের সদস্যসহ সাধারণ মানুষও আধুনিক ব্যাংকিং সেবা সহজে গ্রহণ করতে পারবেন।

এতে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে এবং নাগরিক সেবার মান বৃদ্ধি পাবে। স্থানীয়রা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, পুরো বিষয়টি স্বচ্ছভাবে পর্যালোচনা করে যদি কোনো অযৌক্তিক বাধা বা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা থেকে থাকে, তবে তা দূর করে দ্রুত উপ-শাখাটি চালুর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। তাদের মতে, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শ্রীপুর পৌরসভার রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক ও গতিশীল হবে এবং সাধারণ মানুষ নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং সেবা লাভ করবেন।

এ বিষয়ে শ্রীপুর পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, “ব্যাংকের বিষয়টি নিয়ে আমি বিস্তারিত বলতে পারব না। তবে পৌরসভায় এবি ব্যাংকের শাখা হলে তা খারাপ হবে-এমনটি বলা যায় না। বরং ভালোই হবে।”

এ বিষয়ে উপজেলা ও পৌর প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাহিদ ভূঞা বলেন, “এবি ব্যাংকের উপ-শাখা স্থাপনের বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনাধীন রয়েছে।”