ববি সংবাদদাতা: পদোন্নতির দাবিতে দীর্ঘ আন্দোলন, আমরণ অনশন, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন এবং প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত কোনো সুরাহা মেলেনি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) শিক্ষকদের। অবশেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জারীকৃত অভিন্ন নীতিমালা মেনেই ক্লাসে ফিরেছেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রায় দুই মাস ধরে চলা চরম একাডেমিক ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার অবসান ঘটল।
গত বুধবার (১০ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের কীর্তনখোলা হলে শিক্ষকদের এক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ১২৭ জন শিক্ষকের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি সম্মতিপত্রের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিন্ন নীতিমালা গ্রহণের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
চলতি বছরের ২২ এপ্রিল থেকে পদোন্নতির দাবিতে পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি ও 'কমপ্লিট শাটডাউন' কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষকরা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। ২৮ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন উপাচার্যের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের’ ঘোষণা দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১১ মে শিক্ষকরা রেজিস্ট্রার, অর্থ ও জনসংযোগ দপ্তরসহ সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দপ্তরে তালা লাগিয়ে দেন এবং উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
প্রশাসনিক গতিশীলতা ফেরাতে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম শিক্ষকদের আলোচনার আহ্বান জানালেও তারা সাড়া দেননি। পরবর্তীতে ১৪ মে উপাচার্য নিজে উপস্থিত থেকে প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে দাপ্তরিক কাজ সচল করেন।
তালা ভাঙার ওই দিনই (১৪ মে) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. মামুন অর রশিদকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার যোগদানের পর থেকেই মূলত শিক্ষকদের আন্দোলনের সুর নরম হতে থাকে।
আন্দোলনকারী শিক্ষকরা জানান, নতুন উপাচার্য আইন অনুযায়ী সব সমস্যার সমাধান করবেন—এমন আশ্বাসে তারা আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেন। অবশ্য সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাবেক উপাচার্যও আইনের মধ্য থেকে পদোন্নতি দিতে চেয়েছিলেন, যা শিক্ষকরা তখন মেনে নেননি। নতুন উপাচার্য যোগ দেওয়ার পরপরই ঈদুল আজহার ১৯ দিনের ছুটি শুরু হওয়ায় ক্লাস-পরীক্ষা চালু করতে কিছুটা বিলম্ব হয়। ছুটি শেষে ৭ জুন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে শুরু করে এবং ১০ জুনের সভার মাধ্যমে শিক্ষকরা আনুষ্ঠানিকভাবে নীতিমালার প্রতি লিখিত সম্মতি জানান।
আন্দোলন চলাকালে সাধারণ শিক্ষকদের একটি বড় অংশ ক্ষুব্ধ থাকলেও প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, আন্দোলনের পক্ষে যে স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে, তা মূলত কীর্তনখোলা হলের একটি সাধারণ মতবিনিময় সভার উপস্থিতি খাতা থেকে নেওয়া হয়েছিল। শিক্ষকদের সম্মতি না নিয়েই সেই স্বাক্ষর আন্দোলনের পক্ষে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
অভিন্ন নীতিমালা মেনে ক্লাস-পরিক্ষায় ফেরার বিষয়ে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. ধীমান কুমার রায় বলেন, "শুরুতে অভিন্ন নীতিমালা সম্পর্কে শিক্ষকদের স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেকে এটি মেনে নিতে চাননি। তবে বর্তমান প্রশাসন বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ নম্বর ধারা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এটি মেনে নিয়েছে, আমাদেরও নিতে হতো। তাছাড়া আন্দোলনের কারণে শিক্ষক নিয়োগ আটকে থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি হচ্ছিল। সার্বিক দিক বিবেচনা করেই শিক্ষকরা ক্লাসে ফিরেছেন।"
দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন স্থবির হয়ে পড়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা গেছে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী অমিও মণ্ডল নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, "শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে প্রায় দুই মাস আমরা চরম অনিশ্চয়তায় কাটিয়েছি। আন্দোলন করা তাদের সাংবিধানিক অধিকার, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি একই নীতিমালা মেনেই ক্লাসে ফিরতে হলো, তবে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় কেন নষ্ট করা হলো? আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে যেকোনো সংকটে প্রশাসন ও শিক্ষক সমাজ শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে।"
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ বলেন, "আমি শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে বসে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম এবং তারা বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। এই অভিন্ন নীতিমালা কবে নাগাদ কার্যকর হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি পুরোপুরি আমার হাতে নেই, তবে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব নীতিমালাটি কার্যকর করা হবে।"