কবির আহমদ, সিলেট ব্যুরো

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার বাদ জুমা’ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের উদ্যোগে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বিরোধী মিছিল কাভার করতে গিয়েছিলেন সাংবাদিক এটিএম তুরাব। ঐদিন নগরীর সিটি পয়েন্ট থেকে মিছিল বের করে বর্তমানে সরকারে থাকা বিএনপি। সিটি পয়েন্ট থেকে শুরু করে মধুবন মার্কেট পাড়ি দিয়ে সমবায় ভবনের সামনে মিছিলটি যাওয়া মাত্রই পুলিশ পিছনের দিক থেকে মিছিলকে লক্ষ্য করে হাজারো গুলী ছুড়তে থাকে। হঠাৎ এসএমপি’র কোতোয়ালী থানার তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার বর্তমানে কারাগারে অন্তরীণ সাদেক কাউছার দস্তগীর কোতোয়ালী থানার ওসি মইন উদ্দিন-গানম্যানের হাত থেকে বন্দুক নিয়ে তুরাবকে উদ্দেশ্য করে গুলী ছুড়তে থাকে। পুলিশের গুলীতে আহত হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তুরাবকে পথচারী ও তার সহকর্মীরা প্রথমে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করেন। উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে আন্দোলনকারী ও হাসিনা বিরোধী মিছিল মিটিং কাভারেজ দেওয়া সাংবাদিকরা চিকিৎসা নিতে আসলে তাদের যেন চিকিৎসা না দেয়া হয় এই নির্দেশে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তুরাবকে চিকিৎসা না করে বেডে ফেলে রাখে। অবস্থা বেগতিক দেখে সাংবাদিক তুরাবকে তার সহকর্মীরা সিলেটের ইবনেসিনা হাসপাতালে ভর্তি করেন। অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে তাৎক্ষণিক এই হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউ তে ভর্তি করেন। মাগরিবের আজানের সাথে সাথেই সন্ধ্যা ৬.৪০ মিনিটে এটিএম তুরাব মৃত্যুবরণ করেন।

সিলেটের প্রবাসী অধ্যুষিত বিয়ানীবাজার উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের বাসিন্দা ও দৈনিক সংগ্রামের বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি, বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মরহুম মাস্টার আব্দুর রহিমের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র এটিএম তুরাব সিলেটে এসেছিলেন বড় সাংবাদিক হওয়ার জন্য। বছর খানিক ধরে কাজ করতেন দৈনিক জালালাবাদের স্টাফ রিপোর্টার ও ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি হিসেবে। কিন্তু মেধাবী ও উদীয়মান এই সাংবাদিক তুরাব সামনে আর এগোতে পারলেন না। খুনী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পুলিশ বাহিনীর গুলীতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর হাতের মেহেদীর রং শুকানোর আগেই তুরাবকে নির্মমভাবে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হলো। তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মোঃ আযরফ (জাবুর) গতকাল সোমবার বিকেলে দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের শরীরে পুলিশের ৯৮টি বুলেট ছিল। একজন মানুষকে হত্যা করতে এত বুলেট এর কী দরকার হয়? তার ইউনিফর্ম এর সামনে ও পিছনে প্রেস লেখা ছিলো, এরপরও পুলিশ তাকে হত্যা করলো। তুরাবের মামলা বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে প্রক্রিয়াধীন আছে। স্বাক্ষী নেওয়ার নামে তদন্তকারী কর্মকর্তারা সিলেটে এসে কালবিলম্ব করছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমার ভাইতো জাতিকে ফ্যাসিস্টের কবল থেকে মুক্ত করতে পেশাধারিত্বের কাজে মাঠে নেমেছিল।’ তিনি দুঃখ করে আরও বলেন, ‘আজ পর্যন্ত সিলেট বিভাগের ১৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১ জন সদস্যও সংসদ অধিবেশনে সিলেট বিভাগের একমাত্র শাহাদত বরণকারী সাংবাদিক এটিএম তুরাব হত্যার বিচার চাননি।’ পরিবারের পক্ষ থেকে সাংবাদিক এটিএম তুরাব হত্যাকারীর বিচার সংসদে জোরালোভাবে উপস্থাপনের দাবি জানান তার পরিবারের পক্ষ থেকে তার ভাই জাবুর। তিনি জানান, ‘গত ১৯ জুলাই আমার ভাইয়ের ২য় শাহাদত বার্ষিকী ছিল। স্থানীয় সংসদ সদস্য এডভোকেট এমরান আহমেদ চৌধুরীসহ তার সহকর্মীরা কবর জিয়ারত করেন গ্রামের বাড়িতে এসে। আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু তার হত্যাকারীর বিচার ত্বরান্বিত করার জন্য সংসদ ও রাজপথে জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান জাবুর।’

শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাবের শাহাদাতের ২ বছর পূর্ণ হলো গত ১৯ জুলাই। ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে ২ বছরে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। ক্ষমতার মসনদে বসেছে নির্বাচিত সরকার। সেই সরকারের মেয়াদও ৬ মাস হতে চলেছে। কেবল শেষ হয়নি তুরাব হত্যার বিচার। ২ বছরে অর্জন কেবল ২ জন আসামী গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছে ও এ মামলার তদন্ত চলছে।

প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মিডিয়ায় পুলিশের গুলীর জলজ্যান্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এখনো তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতায় আটকে আছে সিলেটের ইতিহাসে প্রথম পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের গুলীতে নিহত শহীদ সাংবাদিক তুরাব হত্যার বিচার। এদিকে দফায় দফায় তদন্তের নামে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বিচার নিয়ে হতাশা বেড়েছে শহীদ পরিবারের সদস্যদের মাঝে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ সিলেটের সাংবাদিক সমাজ। নগরীর ব্যস্ততম এলাকা কোর্টপয়েন্টে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের গুলীতে নিহত হন দৈনিক জালালাবাদের স্টাফ রিপোর্টার আবু তাহের মো. তুরাব (এটিএম তুরাব)। এরপর কেটে গেছে ২ বছর। এই সময়ে এসএমপির কোতোয়ালী থানা, পিবিআই হয়ে মামলাটি এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-আইসিটিতে। অপেক্ষা বাড়ছে বিচারের। মৃত্যুর আগে ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে চান শহীদ তুরাবের মা, স্বামী হত্যার বিচার দেখতে চান বিয়ের ৩ মাসের মাথায় প্রিয়জনকে হারানো স্ত্রী ও তুরাবের ভাই-বোনেরা।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বাদ জুমআ নগরীর বন্দরবাজার এলাকায় ছাত্র-জনতার উপর নৃশংস গণহত্যার প্রতিবাদে মিছিল বের করে বিএনপি। তখন ন্যুনতম কোনো উত্তেজনা ছিলনা। নিত্যদিনের মতো সেদিনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিকগণ। পাশেই ছিল পুলিশের সশস্ত্র অবস্থান। হঠাৎই অতিউৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা এসএমপির তৎকালীন সহকারী কমিশনার সাদেক কাউসার দস্তগীরের মারমুখী আচরণে বদলে যায় পরিস্থিতি। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কোর্ট পয়েন্ট এলাকা। ঐ পুলিশের কিলিং মিশনের টার্গেটে পড়ে যান সাংবাদিক এটিএম তুরাব। পুলিশের ছুঁড়া ৯৮টি ছররা গুলী বিদ্ধ হয় তুরাবের শরীরে।

তুরাবের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. শামসুল ইসলাম তখন জানিয়েছিলেন, তুরাবের শরীরে ৯৮টি ছররা গুলীর চিহ্ন পাওয়া গেছে। গুলীতে তার লিভার ও ফুসফুস আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মাথায়ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।

সাংবাদিক এটিএম তুরাব শহীদ হওয়ার মাত্র তিন মাস আগে লন্ডনে বসবসারত এক কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। লন্ডন যাওয়ার সব প্রক্রিয়া এগিয়েও রেখেছিলেন। হয়তো কয়েক মাসের মধ্যে তার লন্ডন পাড়ি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই পুলিশের গুলীতে ঝাঁজরা হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয় তাকে। এমন ঘটনায় হতবাক হয়ে পড়ে তার পরিবার। লন্ডনে থাকা সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী তানিয়া ইসলাম বিয়ের তিন মাসের মধ্যে হয়ে যান বিধবা। এখনো কাঁদেন তিনি। তার কান্না যেন থামছে না। কারণ তুরাবের মৃত্যুর সময় দেশে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় স্বামীর লাশ ও শেষ বিদায়ের দৃশ্য দেখতে পারেননি তিনি। সাংবাদিক তুরাব হত্যার দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে তুরাব হত্যা মামলায় এসএমপির তৎকালীন এডিসি সাদেক কাউসার দস্তগীর ও পুলিশ কনস্টেবল উজ্জল সিংহ কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু এসএমপির তৎকালীন ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আজবাহার আলীসহ এজাহারভুক্ত অধিকাংশ আসামী এখনো বাইরে থাকায় ন্যায়বিচার নিয়ে পরিবার ও সহকর্মীদের মাঝে দেখা দিয়েছে সংশয়।

শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাব হত্যার ঘটনায় মৃত্যুর ৫ দিনের মাথায় একই বছরের ২৪ জুলাই সাংবাদিক তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মো. আজরফ (জাবুর) এসএমপির কোতোয়ালি মডেল থানায় আট থেকে ১০ জন পুলিশকে অভিযুক্ত করে এজাহার দাখিল করেন। কিন্তু কোতোয়ালি থানা পুলিশ সেটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ না করে জিডি হিসেবে নথিভুক্ত করে। এরপর সেই বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর ১৯ আগস্ট সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল মোমেনের আদালতে এটিএম তুরাব হত্যার ঘটনায় পুনরায় মামলা দায়ের করেন তার ভাই আবুল আহসান মো. আযরফ (জাবুর)। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখসহ ২০০-২৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামী করা হয়েছে। আদালত শুনানি শেষে মামলার এফআইআর করার নির্দেশ দেন। মামলায় ২নং আসামী এসএমপির তৎকালীন উপকমিশনার (ক্রাইম উত্তর) মো. সাদেক দস্তগীর কাউসার, ৩নং আসামি তৎকালীন অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আজবাহার আলী শেখ ও ৪নং আসামী হন কোতোয়ালী থানার তৎকালীন সহকারী কমিশনার মিজানুর রহমান। এ মামলার অন্য আসামীরা হলেন- এসএমপির কোতোয়ালি মডেল থানার বন্দরবাজার ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ কল্লোল গোস্বামী, থানার তৎকালীন ওসি মঈন উদ্দিন, ওসি (তদন্ত) ফজলুর রহমান, থানার এসআই কাজি রিপন সরকার, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ৭নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আফতাব উদ্দিন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি পিযূষ কান্তি দে, যুবলীগ নেতা ও সিসিকের তৎকালীন গণসংযোগ কর্মকর্তা সাজলু লস্কর, সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সিসিকের ৩২নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রুহেল আহমদ, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সজল দাস অনিক, নগরের চালিবন্দর নেহার মঞ্জিলের বাসিন্দা শিবলু আহমদ (মো. রুহুল আমিন), এসএমপির কনস্টেবল সেলিম মিয়া, কনস্টেবল আজহার, কনস্টেবল ফিরোজ ও কনস্টেবল উজ্জ্বল। এছাড়া মামলায় ২০০-২৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়।

২০২৫ সালের ২০ জুলাই প্রথমবারের মতো তুরাব হত্যা মামলার দুই আসামীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। চাওয়া হয় রিমান্ড। গত বছরের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে চার্জশীট দাখিল করার কথাও জানিয়েছিলেন আইসিটি কোর্টের তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তাগণ। কিন্তু এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে আরও দুই বছর। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সামনে চলে আসছে আরেক আগস্ট। দীর্ঘ দুই বছরে এই মামলায় দু’জন আসামী গ্রেফতার হলেও বাকিরা এখনো পলাতক। গেল বছর মামলাটি পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কোর্টে স্থানান্তর করা হয়। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলাটি স্থানান্তরের পর আইসিটি কোর্টের তদন্ত টীম দফায় দফায় সিলেট সফর করেন। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য নেন। তুরাব হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি চান যেমন তার সহকর্মীরা তেমন শাস্তি চান গোটা সিলেটবাসী।