ড. আবদুল আলীম তালুকদার
বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ এই দুই মাস গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মকালে প্রচুর গরম পড়ে তাই এই ঋতুকে গরমকালও বলা হয়। ঋতুচক্রে গরমকাল হলেও, ফলের বিবেচনায় এই ঋতুকে বলা হয় মধুঋতু। আর জ্যৈষ্ঠ মাসকে সম্বোধন করা হয় মধুমাস নামে। মধুমাসে আমাদের দেশে নানান ধরনের ফলের সমারোহ ঘটে। আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, বেল, আনারস, বাঙ্গি, আমলকীসহ আরও কত রকমের ফল উৎপাদিত হয় আমাদের দেশেÑ যা খাদ্যের পাশাপাশি পুষ্টিরও যোগান দেয়। তাই জেনে নেই এ সময়ে উৎপাদিত ফলসমূহ শরীরের জন্য কি কি উপকার করে থাকে।
আম : আম কাঁচা-পাকা উভয় অবস্থাতেই শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি ফল। কাঁচা আম যেমন রান্না করে খেতে মজা, তেমনই মধুময় পাকা আমের স্বাদ। পাকা আমের তুলনায় কাঁচা আমের পুষ্টিগুণই বেশী। তবে মধুময় ফলটি শুধু স্বাদে নয় গুনেও অনন্য। পাকা আম ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ ফল। এছাড়াও আমে ভিটামিন বি ও সি, খনিজ লবণ, ক্যালসিয়াম ও প্রচুর খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়। আমে বিদ্যমান ক্যারোটিনয়েডগুলো কোলন ও ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়, চোখ সুস্থ রাখে, সর্দি-কাশি দূর করে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং বয়সজনিত চোখের সমস্যা প্রতিরোধ করে।
জাম : বাংলাদেশের সুপরিচিত একটি ফল জাম। কালো জামে আছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি। জামে নানা রকম খনিজ পদার্থের মধ্যে জামে আয়রন থাকে সবচেয়ে বেশি। সেজন্য বলা হয় জাম খেলে রক্ত পরিষ্কার হয়। এছাড়া সর্দি-কাশি, হজমের গণ্ডগোল ও বাতের অসুখে জাম উপকারী। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সময় জ্বর, সর্দি ও কাশির প্রবণতা বাড়ে, জামে এটি দূর হয়। জামের ভিটামিন এ চোখ ভালো রাখতে সাহায্য করে।
কাঁঠাল : পৃথিবীতে যত রকমের ফল উৎপন্ন হয় তার মধ্যে আকারের দিক থেকে কাঁঠাল সবচেয়ে বড়। কাঁঠাল বেশ শক্তিদায়ক, পুষ্টি সমৃদ্ধ ও উচ্চ ক্যারোটিন সমৃদ্ধ একটি ফল, যাতে শর্করা, প্রোটিন, ভিটামিন সি, বি ও পটাশিয়াম যেমন আছে; তেমনি আছে থায়ামিন, রিবোফাভিন, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, সোডিয়াম, জিঙ্ক এবং নায়াসিনসহ বিভিন্ন প্রকার পুষ্টি উপাদান। অন্যদিকে কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণে আমিষ, শর্করা ও ভিটামিন থাকায় তা মানব দেহের জন্য বিশেষ উপকারী। বিশেষ করে কাঁঠালের বীজ পুষ্টিমানের দিক থেকে খুবই সমৃদ্ধ এবং সবজি হিসাবে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
লিচু : লিচু গ্রীষ্মকালীন একটি মিষ্টি, সুস্বাদু ও রসালো ফল। পুষ্টির দিক দিয়েও বেশ সরস। মিষ্টি গন্ধ ও স্বাদের রসালো ফল লিচুতে রয়েছে শর্করা, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সি। এছাড়া এই ফলে বিদ্যমান বি ভিটামিনগুলো বিপাক ক্রিয়া ত্বরান্বিত করতেও পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। লিচুর খাদ্য-আঁশ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো রোগপ্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এছাড়া লিচুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে শ্বেতসার, ভিটামিন ও খনিজ লবণ। চর্মরোগ সারাতে রয়েছে এর বিশেষ কার্যকারিতা। কাশি, পেটে ব্যথা ও টিউমার বৃদ্ধি রোধে লিচু অনেক উপকারী। এ দিয়ে জ্যাম তৈরি করে সংরক্ষণ করা যায়।
আনারস : এ সময়কার আরেকটি সুস্বাদু ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল আনারস। পাকা আনারস শক্তি বাড়ায়। কফ নিরাময়ে সহায়ক, পিত্তনাশক এবং হজম বৃদ্ধি করে। সর্দি-কাশিতে আনারস খেলে শ্লেষ্মা ও মিউকাসকে তরল করে। আনারসে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ এ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান। যেগুলো শরীরের কোষকে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। এতে রয়েছে প্রচুর ক্যালরি, যা আমাদের শক্তি জোগায়।
বাঙ্গি : হলুদ রঙের ক্যারোটিনযুক্ত এ ফলটি বেশ মিষ্টি হয়ে থাকে। বাঙ্গির জুস ওজন কমায়। কারণ এতে ক্যালরির পরিমাণ কম থাকে। অল্প খেলেও পেট ভরে যায়। বাঙ্গি মূত্র ও মূত্রথলির প্রদাহ রোধ করে। কোষ্ঠবদ্ধতা, অ্যাসিডিটি ও পেপটিক আলসারে বাঙ্গি কার্যকর। এটি আঁশযুক্ত এবং ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। এতে ভিটামিন এ, ফোলেট, পটাশিয়াম ও সামান্য পরিমাণে প্রোাটিন ও ভিটামিন সি আছে। বাঙ্গির অন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়, শরীরের তাপমাত্রা কমায়, ক্লান্তি দূর করে, উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায় ও হাড় ক্ষয় রোধ করে।
তরমুজ : ফলের জগতে বৃহৎ আকৃতির ফল তরমুজ। গরমে শরীর ঠাণ্ডা রাখতে তরমুজের জুড়ি মেলা ভার। তরমুজের নানান রকম উপকারিতা রয়েছে। এই ফলে শতকরা প্রায় ৯২ ভাগ পানি আছে। তাই তরমুজ খেলে সহজেই পানির তৃষ্ণা মেটে। তরমুজের বিশেষ কয়েক ধরনের অ্যামাইনো এসিড নাইট্রিক অক্সাইড তৈরি করে রক্তের স্বাভাবিক কার্যপ্রণালী বজায় রাখে। উচ্চরক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে। তরমুজে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ আছে। এতে বিটা ক্যারোটিনের পরিমাণও অনেক। বিটা ক্যারোটিন চোখ ভালো রাখে।
বেল : সারা বছর পাওয়া গেলেও গরমকালে এই ফলের চাহিদা বেশি দেখা যায়। বেলে প্রচুর শর্করা, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ লবণ আছে। কাঠফাটা দুপুরে বেলের শরবত প্রাণ জুড়ায়। কোষ্ঠকাঠিন্য ও আমাশয় সারাতে বেল অনেক উপকারী। এই ফলের পাতার রস মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খেলে চোখের ছানি ও চোখ জ্বালা করা রোগের উপশম হয়।
জামরুল : রসালো ও হালকা মিষ্টি জামরুল গ্রীষ্মকালেই পাওয়া যায়। এটি ভিটামিন বি-২ সমৃদ্ধ ফল। বর্তমানে সাদা, খয়েরি-লাল ও হালকা গোলাপি রংয়ের জামরুল দেখা যায়। এই ফলের রং ও আকৃতি বেশ সুন্দর। এটি রসালো ও পুষ্টিকর। এতে জলীয় অংশ বেশি থাকে বলে ক্যালরি ও শর্করা কম। এ জন্য ডায়াবেটিস রোগে জামরুল বেশি খাওয়া যায়। রক্তে সোডিয়াম বেড়ে গেলে এটি সোডিয়াম কমাতে সাহায্য করে। এটি আঁশসমৃদ্ধ ও হজমে সহায়ক।
কামরাঙা : কামরাঙা একটি জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন ও বারোমাসি টক-মিষ্টি ফল, যা দেখতে পাঁচ কোণা তারার মতো। প্রধানত টক ও মিষ্টি- দুই ধরনের কামরাঙা পাওয়া যায়। এটি একটি অবহেলিত হলেও অত্যন্ত পুষ্টিকর দেশি ফল, যা গ্রামাঞ্চলে বাড়ির আশেপাশে প্রচুর জন্মে। এটি ভিটামিন সি, এ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের চমৎকার উৎস, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হজমে সহায়তা করে এবং শরীর ঠাণ্ডা রাখে। কাঁচা, ভর্তা বা জুস হিসেবে খাওয়ার পাশাপাশি এটি থেকে জ্যাম-আচারও তৈরি করা হয়।
পেয়ারা : পেয়ারা একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও জনপ্রিয় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল, যা ভিটামিন সি, ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। আমাদের দেশী পেয়ারার পাশাপাশি কাজী পেয়ারা, বারোমাসি, এবং মেক্সিকান ক্রিমসন জনপ্রিয় জাত। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, হজমশক্তি উন্নত করা, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। ক্যালোরি কম হওয়ায় এটি ওজন কমানোর জন্যও একটি আদর্শ ফল। পেয়ারা ভিটামিন সি-এর সেরা উৎস। পেয়ারায় আপেল ও কমলার চেয়েও বেশি ভিটামিন সি থাকে, যা দাঁত, মাড়ি ও ত্বকের জন্য খুব উপকারী। এর উচ্চ ফাইবার অন্ত্র পরিষ্কার রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
করমচা : টক স্বাদের ছোট আকৃতির মুখরোচক একটি ফল করমচা। করমচায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও খনিজ। এ ফলের অনেক গুণ। এতে আছে জলীয় রস, প্রোটিন, খনিজ, স্নেহ, শর্করা। এ ছাড়া খনিজের মধ্যে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং লৌহ রয়েছে। ক্যালরি, রিবোফ্লেভিন, নায়াসিন, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, কপার এবং ভিটামিন সি। করমচায় চর্বি এবং ক্ষতিকর কোলস্টেরল থাকে না। ভিটামিন সিতে ভরপুর করমচা মুখে রুচি বাড়ায়।
আমলকি : আমলকি হালকা সবুজ ও হলুদাভ রঙের গোলাকার রসালো এবং মাংসালো ফল। ফলটি প্রধানত টক স্বাদের হলেও এতে মিষ্টি, লবণ, তেতোসহ আরো পাঁচটি স্বাদ পাওয়া যায়। এর জন্মস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। পাহাড়ের প্রায় দেড় হাজার মিটার উচ্চতায়ও আমলকি গাছ ভালো জন্মে। ছোট এ ফলটিতে রয়েছে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ ভিটামিন সি। চিকিৎসকদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন দুটি করে আমলকি খেলে সহজেই ভিটামিন সি-র চাহিদা মিটবে। ভেষজগুণেও আমলকির জুড়ি নেই। ফল ও পাতা দুটোই ওষুধরূপে ব্যবহার করা হয়।
আতা : আতা সুপরিচিত ফল। এতে রয়েছে নানা গুণ। শুধু স্বাদের কারণেই নয়, স্বাস্থ্যের জন্য এটি দারুণ উপকারী ফল। ভিটামিন সির মতো নানা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে এতে। শরীরে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুকণা থেকে মুক্তি দিতে পরে আতা। এ ছাড়া কোষ্ঠ পরিষ্কার, অরুচি দূর করা, ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়ানো ও দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখার প্রয়োজনে আতা খাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞগণ বলেন, ভিটামিন ও মিনারেলসমৃদ্ধ এ ফল শরীরের জন্য খুব কাজের। এ ফলে রয়েছে ভিটামিন এ, যা চোখের কর্নিয়া ও রেটিনাকে সুরক্ষিত রাখে।
লেবু : লেবু একটি জনপ্রিয় ফল যা ব্যবহারে খাবারের স্বাদে ভিন্নতা অনুভব হয়। মুখের রুচি বাড়াতে লেবুর জুড়ি নেই। বাজারে বিভিন্নরকম লেবু পাওয়া যায়। কাগজি লেবু, পাতি লেবু, গন্ধরাজ, কমলা লেবু, মোসাম্বি লেবু ও বাতাবি লেবু খুব পরিচিত আমাদের কাছে। লেবুতে ভিটামিন এ, ভিটামিন বি ৬, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ফসফরাস, ফোলেট, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, প্যানটোথেনিক অ্যাসিড, আয়রন, দস্তা, তামা, নিয়াসিন থায়ামিন এবং আরও অনেক প্রোটিন রয়েছে। স্বাস্থ্যের জন্য খুব উপকারী এই পুষ্টিগুলো। পেটের গোলযোগ তথা বদহজম, কোষ্টকাঠিন্যের জন্য লেবু আদর্শ টনিক।