॥ মেশকাতুন নাহার ॥
জীবনের সব পথ গন্তব্যে পৌঁছায় না; কিছু পথ কেবল অপেক্ষার বৃত্ত এঁকে যায়। চারদিকে যখন অগ্রগতির সোপানে নতুন পদচিহ্ন আঁকা হয়, তখন কিছু মানুষ নীরবে একই সিঁড়ির একই ধাপে সময়ের ধুলো জমতে দেখেন। তাঁদের দিনপঞ্জিতে ঋতু বদলায়, ক্যালেন্ডার বদলায়, দায়িত্ব বদলায়; কিন্তু বদলায় না প্রত্যাশার নীরব ঠিকানা। যেন নিয়তির কোনো অদৃশ্য গোলকধাঁধায় তাঁরা চলেই যাচ্ছেন-যেখানে প্রতিটি মোড় নতুন আশার ইঙ্গিত দেয়, অথচ পথ আবার ফিরে আসে সেই একই স্থানে।
এ যেন এমন এক সিঁড়ি, যার প্রথম ধাপেই লেখা-“আর উপরে ওঠার ব্যবস্থা নেই।” চাকরি আছে, দায়িত্ব আছে, জবাবদিহিতা আছে, কিন্তু সম্ভাবনা নেই। বছরের পর বছর একই পদে থেকে তাঁরা বুঝে গেছেন, এখানে অভিজ্ঞতার বয়স বাড়ে, পদমর্যাদার নয়।
মজার বিষয় হলো, তাঁদের কাছে সবকিছুর প্রত্যাশা থাকে-ফলাফল ভালো চাই, পরীক্ষা সুষ্ঠু চাই, প্রশাসনিক কাজ চাই, জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান চাই, অনলাইন রিপোর্ট চাই, আবার প্রয়োজনে অতিরিক্ত দায়িত্বও চাই। শুধু একটি জিনিস কেউ চায় না-তাঁদের ন্যায্য পেশাগত অগ্রগতি। কখনো মনে হয়, জাতীয়করণকৃত কলেজের শিক্ষকরা বুঝি গবেষণার বিষয়-“কীভাবে পদোন্নতি ছাড়া আজীবন কর্মোদ্যম ধরে রাখা যায়!” অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হলে কর্মস্পৃহাও ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়। যে প্রতিষ্ঠানে স্বীকৃতির চেয়ে দায়িত্ব বেশি, সেখানে উদ্যমের চেয়ে দীর্ঘশ্বাসই বেশি জন্ম নেয়।
শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক অবিরাম সাধনা। সে সাধনার পথচলায় দায়িত্বের পাশাপাশি যদি অগ্রগতির স্বাভাবিক সম্ভাবনাও বিকশিত হয়, তবে কর্মস্পৃহা আরও উজ্জ্বল হয়, সৃজনশীলতা আরও প্রসারিত হয়। কারণ স্বপ্ন কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের জন্য নয়; স্বপ্নই মানুষকে প্রতিদিন নতুন উদ্যমে দায়িত্ব পালন করতে শেখায়। আর যে পথ দীর্ঘদিন শুধু অপেক্ষাকেই সঙ্গী করে রাখে, সেখানে দীর্ঘশ্বাস একসময় নীরব ভাষায় পরিণত হয়।
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।