দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবাই সরব, তারপরও দুর্নীতির মাত্রা বেড়েই চলেছে। এর কারণ কী? নীতির অভাবেই তো দুর্নীতি ঘটে থাকে। আসলে নীতির চাইতেও নীতিনিষ্ঠ মানুষের অভাব বর্তমান সভ্যতায় প্রকট। এমন সংকট লক্ষ্য করা যায় দেশে-বিদেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। এমন বাস্তবতায় রামমন্দিরের দুর্নীতি ঘিরে ভারতে সৃষ্টি হয়েছে তোলাপাড়। বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকের কলকাতা প্রতিনিধির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মুঘল স্থাপনা বাবরি মসজিদ ভেঙে গড়া হিন্দুত্ববাদীদের সাধের রামমন্দিরে এবার চুরির ঘটনা ঘটেছে। অযোধ্যার এই মন্দিরে অনুদানের টাকা তছরুপেরও অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতজুড়ে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
আলোচ্য ঘটনায় উত্তরপ্রদেশ সরকারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) ইতিমধ্যেই বড়সড় গাফলতির প্রমাণ পেয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে নগদ ও মূল্যবান সামগ্রী গোনার দায়িত্বে থাকা আটজনকে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৭৯ লাখ ৮৫ হাজার রুপি। মিলেছে কিছু বিদেশী মুদ্রাও। প্রাথমিক তদন্তে অনুদান পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়মের চরম লংঘন ধরা পড়েছে। অনুদান গোনার সময় কর্মীদের তল্লাশি করা হয়নি। সেখানে কোনো নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন ছিল না। সিসিটিভি ফুটেজ ১৮০ দিনের বদলে মাত্র ৪৫ দিন সংরক্ষণ করা হয়েছিল। অনুদান বক্সের চাবি ছিল রামশঙ্কর যাদব ওরেফে তিন্নু যাদবের কাছে। তিনি ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইয়ের প্রাক্তন গাড়িচালক। এটি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। সিট জানিয়েছে, অনুদান গোনার দায়িত্বে থাকা অভিযুক্ত সুভাষ শ্রীবাস্তবকে নিয়ম ভেঙে নিয়োগ করা হয়েছিল। ট্রাস্টের অন্যতম শীর্ষ এক কর্মকর্তার সুপারিশে তার চাকরি হয়। গত ৭ জুন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এই দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। তার আগে প্রাক্তন এসপি বিধায়ক পবন পাণ্ডে বড়সড় দাবি করেছিলেন। তার মতে, সাড়ে সাত থেকে ২৭ কোটি রুপি তছরুপ হয়েছে। শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই প্রথমে এই অভিযোগ উড়িয়ে দেন। তবে ১৪ জুন উত্তর প্রদেশ সরকার তিন সদস্যের ‘সিট’ গঠন করে। এরপর ২৫ জুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় এফআইআর দায়ের করা হয়। অনুকল্প মিশ্র, লবকুশ মিশ্র, অবিনাশ শুক্লা, তিন্নু যাদব, মনীশ যাদবসহ আটজনের নাম রয়েছে এই এফআইআরে। এরপর গত শুক্রবার নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেন চম্পত রাই এবং ট্রাস্টি অনিল মিত্র।
শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই প্রথমেই দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করলেও, পরে নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেছেন। তবে বিষয়টি বোধহয় এতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। গত শনিবার মহারাষ্ট্রের ইয়াবাৎমাল ওয়াশিম কেন্দ্রে এক জনসভায় বিজেপির তীব্র সমালোচনা করে শিবসেনা (উদ্ধব) প্রধান উদ্ধব ঠাকরে বলেন, বিজেপি হিন্দুদের আবেগের সঙ্গে খেলছে। তারা হিন্দুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। মন্দির লুট করার এই হিন্দুত্বকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ‘বিজেপিমুক্ত রাম’ গড়ার ডাক দিয়েছেন। এজন্য নেতৃত্ব দেবে তার দল।
কংগ্রেসও এই ইস্যুতে বিজেপি, আরএসএস এবং কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী রাম মন্দিরে দুর্নীতির ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ ও ‘দুঃখজনক’ আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, সাধারণ মানুষ, গরিব নারী ও শিশুদের জমানো টাকা এভাবে চুরি যাওয়াটা গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এর পেছনে বড় চক্রান্তকারীদের হাত থেকতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। উপলব্ধি করা যায়, রাম মন্দিরে দুর্নীতির ঘটনা ভারতের সমাজ ও রাজনীতিতে বড় ধরনের নাড়া দিয়েছে। শিবসেনার নেতা তো ‘বিজেপিমুক্ত রাম’ গড়ার ডাক দিয়েছেন। ‘বিজেপিযুক্ত রাম’ এবং ‘বিজেপিমুক্ত রাম’-এর যে প্রসঙ্গ উঠে এলো, তা ‘রাম মন্দিরের’ ভাবমর্যাদায় আঘাত হেনেছে। রামমন্দির নিয়ে যারা রাজনীতি করছেন, তারা রামের মর্যাদা রক্ষা করবেন কেমন করে? এজন্য তো ধর্মনিষ্ঠা ও সত্যনিষ্ঠা প্রয়োজন। এ জিনিসের অভাবে ভারতের সংকটের মাত্রা বাড়ছে, সংকটের মাত্রা বাড়ছে পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও। অতএব শুদ্ধি প্রয়োজন।