একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলো তার ব্যাংকিং খাত। মানুষের সঞ্চয়, ব্যবসায় বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান- সবকিছুর সঙ্গে ব্যাংকের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই ব্যাংক খাত শক্তিশালী হলে অর্থনীতি এগিয়ে যায়, আর ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো অর্থনীতিই সংকটে পড়ে। বাংলাদেশে বর্তমানে ঠিক এমন একটি পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়ন বলছে, দেশের ব্যাংকিং খাত এখন দীর্ঘদিনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকট কোনো একদিনে তৈরি হয়নি, বরং বছরের পর বছর ধরে ভুল সিদ্ধান্ত, দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সুশাসনের অভাবের ফলে এটি আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তবে এই সংকটের দায় আসলে কার? বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশই এখন ঝুঁকিপূর্ণ (Distressed Loan)। অর্থাৎ যেসব ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুব কম কিংবা দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে, সেগুলোর পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণই ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কয়েকটি বড় ব্যাংকের অবস্থাই সবচেয়ে খারাপ- ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা, আর জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৭২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে সংকটটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়, এটি পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি।

সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যাংকগুলোর আর্থিক ক্ষতি। একসময় ব্যাংকগুলো নিয়মিত মুনাফা করলেও এখন সেই চিত্র পাল্টে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ব্যাংকিং খাত সম্মিলিতভাবে প্রায় ১.৩৬ লাখ কোটি টাকা নিট লোকসানের মুখে পড়ে, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে গত এক দশকে প্রথম। অথচ তার আগের বছর এই খাত লাভে ছিল। কয়েকটি ইসলামী ধারার ব্যাংক, বিশেষ করে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের বড় অঙ্কের লোকসান পুরো খাতের দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একটি ব্যাংক যখন লাভ করতে পারে না, তখন আমানতকারীদের আস্থা কমে যায়, নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হয়। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়Ñ এই সংকটের দায় আসলে কার?

প্রথমত, রাজনৈতিক প্রভাব। এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে অনেক বড় ব্যবসায়ীগোষ্ঠী নিয়মবহির্ভূতভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জামানত ছাড়াই বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। পরে সেই অর্থের বড় অংশ আর ব্যাংকে ফেরত আসেনি। এস আলম গ্রুপকে ঘিরে আলোচিত ঋণ বিতরণ কিংবা অতীতে বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি দেখিয়েছে, রাজনৈতিক আশ্রয় থাকলে ব্যাংকের নিয়ম ভঙ্গ করেও বিশাল অঙ্কের অর্থ নেওয়া সম্ভব হয়েছে। ফলে সাধারণ আমানতকারীর অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক ভূমিকার দুর্বলতা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব হলো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি করা। কিন্তু বাস্তবে বহু বছর ধরে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে সৎ ঋণগ্রহীতারা যেমন নিরুৎসাহিত হয়েছেন, তেমনি ইচ্ছাকৃত খেলাপিরাও নতুন করে সুবিধা পেয়েছেন। বিশ্বব্যাংকও তাদের বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অতিরিক্ত নমনীয়তা বা Regulatory Forbear-ance বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি হয়তো এতটা খারাপ হতো না।

তৃতীয়ত, ব্যাংকের পরিচালনা কমিটিতে সুশাসনের অভাব বড় একটি কারণ। অনেক ব্যাংকে একই পরিবারের একাধিক সদস্য দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা বোর্ডে রয়েছেন। এতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ কমে যায় এবং স্বজনপ্রীতির ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পরিচালকদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঋণ দেওয়া হয়েছে। আবার অভিযোগ রয়েছে, নামবিহীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে অর্থ বের করে বিদেশে পাচারও হয়েছে। এসব কারণে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে এবং সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা কমেছে।

চতুর্থত, নীতিগত ও আইনি দুর্বলতাও সংকটের জন্য দায়ী। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক খাতে কিছু নতুন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এগুলোর কিছু বিধান বিতর্কিত। যেমন- ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্ট– ২০২৬ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কিত মালিকদের পুনরায় ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় ফেরার সুযোগ তৈরি হওয়ায় সংস্কারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে পুরোনো সমস্যাগুলো আবার ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ব্যাংক খাতের এই সংকটের প্রভাব কেবল ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পুরো অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ফলে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না। অন্যদিকে সাধারণ মানুষও ব্যাংকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। আমানতের ওপর আস্থা কমে গেলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ আগামী সময়ে আরও বড় অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে একটি শক্তিশালী আর্থিক খাত অপরিহার্য। কিন্তু ব্যাংকিং খাত যদি দুর্বল থাকে, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, রপ্তানি ও শিল্পায়ন ব্যাহত হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এই সংকটকে শুধু ব্যাংকের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এটি জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে এই সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য কী করা উচিত?

প্রথমত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা সক্ষম হয়েও ঋণ পরিশোধ করেন না, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার, সম্পদ জব্দ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেলে তা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এতে অন্যদের জন্যও একটি শক্ত বার্তা যাবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন নিয়ম প্রয়োগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (ঈচউ)-এর অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান যথার্থই বলেছেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সংকট প্রযুক্তিগত সমস্যার চেয়ে রাজনৈতিক সমস্যাই বেশি। তাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদে যোগ্য ও স্বাধীন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, স্বজনপ্রীতি কমাতে হবে এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি দুর্বল ব্যাংকের সম্পদের প্রকৃত মান যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।

চতুর্থত, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ব্যাংকিং খাতের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো আধুনিকায়ন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা গেলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অনিয়ম আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, ব্যাংক খাতের এই সংকটের জন্য শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যায় না। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব এবং নীতিগত দুর্বলতাÑ সবকিছুর সম্মিলিত ভূমিকা রয়েছে। তাই দায়ও এককভাবে কারও নয়, দায় ভাগ করে নিতে হবে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংকের পরিচালনা কমিটি এবং অসাধু ঋণগ্রহীতাদের। তবে দোষারোপের রাজনীতি করে এই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় বাধায় পরিণত হতে পারে।