জামায়াতে ইসলামীকে জানতে হলে ১০০ বছরের ইতিহাস জানতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন জামায়াতের প্রবীণ সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় অংশ নিতে তিনি একথা বলেন।
শাহজাহান চৌধুরী বলেন, এই পার্লামেন্টটা হচ্ছে নির্যাতিত, নিপীড়িত, অসহায় মানুষের আহাজারির, মজলুমের আহাজারির সর্বশেষ বাড়ি। এই পার্লামেন্ট হচ্ছে ১৮ কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার একটি পার্লামেন্ট। এই পার্লামেন্ট বিগত ৫৪ বছর এর মত নয়। নির্বাচনের আগেই আমরা একটা স্লোগান দিতাম। চল একসাথে গড়ি বাংলাদেশ। আজকে সেটার রেজাল্ট প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর করে আসার পর আমাদের অপজিশন লিডার, মানবিক ডক্টর শফিকুর রহমানÑ চল একসাথে গড়ি বাংলাদেশ, তার প্রমাণ উনি আজকে এই পার্লামেন্টে দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে উনি প্রশংসিত করে আজকে বাংলাদেশের মানুষকে অতীতের সমস্ত কিছু ভুলে গিয়ে আগামীতে নতুন বাংলাদেশ গড়ার উনি যে অঙ্গীকার নির্বাচনের আগে করেছিলেন, সেটার প্রতিফলন।
এই দেশের মধ্যেই চিকিৎসা করলেন। আল্লাহর মেহেরবানী, উনি চিকিৎসা করলেন, ভালো হলেন। দেশবাসীর কাছে মেসেজ দিলেনÑ আমরা আমাদের দেশের চিকিৎসা জগতকে লজ্জিত করতে চাই না। আমাদের দেশের চিকিৎসা জগত সম্পর্কে অপজিশন লিডার স্বীকৃতি দিলেন।
তিনি বলেন, সাংবাদিক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বললেন যে, আমার এই বাজেট ব্যবসার পরিবেশকে সহজ করার জন্য। ব্যবসায়ীদের কি বাংলাদেশ? না, বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশ। কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী মানুষ, সর্বস্তরের বাংলাদেশ। আপনি ব্যবসায়ী পরিবার, তাই ব্যবসায়ীদের জন্য বাজেট দিয়েছেন। বাংলার মানুষের জন্য বাজেট দেন নাই। আমি মরহুম সাইফুর রহমান, উনাকে স্মরণ করছি। উনি যখন বাজেট দিতেন, তখন অপজিশন লিডারদের কাছে টেলিফোন করতেন। বাজেট তৈরির ব্যাপারে সহযোগিতা চাইতেন।
তিনি আরো বলেন, এইবারের বাজেট যারা তৈরি করেছেন, এরা কারা? এরা কি ৩৬শে জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করেন? স্বৈরশাসক, ফ্যাসিস্ট, তাদের বাজেট যারা তৈরি করেছেন, এইবারও ঠিক তারাই বাজেট তৈরি করেছেন। এইবারের বাজেটে সবার আগে বাংলাদেশের এই স্লোগানটি কি প্রতিফলিত হয়েছে? এটা যদি প্রতিফলিত হতো, তাহলে আপনারা কৃষি সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছেন, বাজেট পেশ করেছেন, সেটা কি এইখানে আছে?
তিনি চট্টগ্রাম এলাকার গ্যাস ফিল্ড সর্ম্পকে বলেন, ১৯৭০ সালে আমরা চট্টগ্রামবাসী সবাই আশান্বিত হলাম, চট্টগ্রামে আমরা একটি গ্যাস ফিল্ড পেয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর সেইখানে সিসা ঢেলে দিয়ে গ্যাস ফিল্ডটাকে বন্ধ করে দিল। আমরা গ্যাস পেলাম না। আমাদের আজকের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী উনিও গিয়েছিলেন, ডক্টর খন্দকার মোশাররফ গিয়েছিলেন। তাই আজকে আমি দাবি করছি, আমাদের চট্টগ্রামের ওই গ্যাস ফিল্ড ইন্ডিয়া স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক দিক থেকে ধ্বংস করার জন্য আমাদের গ্যাস ফিল্ড শেষ করে দিয়েছিল। বাঁশখালীর চাম্বল আর আমাদের চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার বড়হাতিয়ার এই গ্যাস ফিল্ডকে আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেইখানে গ্যাস পাওয়া যায় কিনা, সেই ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে। অর্থমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করব, আপনি গ্যাস সন্ধানের জন্যে সেখানে বাজেট বরাদ্দ করেন।
তিনি জামায়াতে ইসলামী সর্ম্পকে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস, জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস ইসলামের উপরে যখনই আঘাত এসেছে, জামায়াতে ইসলামী বজ্রকণ্ঠে রাজপথে প্রতিবাদ করেছে। সারা বিশ্বে স্বীকৃতি দিয়েছেÑ জামায়াতে ইসলামী হলো ইসলাম রক্ষার জন্য একটি মাত্র বাংলাদেশে অন্যান্য ইসলামী দলের মত নয়। জামায়াতে ইসলামী গণতান্ত্রিক, নিয়মতান্ত্রিক, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ওয়েলফেয়ার স্টেট কায়েম করার জন্যেই জামায়াতে ইসলামী। তাই নির্বাচনের আগে আমাদের বক্তব্য ছিলÑ ন্যায়, ইনসাফ, বৈষম্যহীন, কল্যাণময় একটি রাষ্ট্র আমরা কায়েম করতে চাই।
তিনি বিদ্যুৎ সর্ম্পকে বলেন, আজকে বিদ্যুৎ, বিদ্যুতের অবস্থা কোথায়? আপনারা ক্ষমতায় আসলেন চার মাস, এখনো পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ আপনাদেরকে দিতে হচ্ছে। এই ক্যাপাসিটি চার্জ দুর্নীতির একটি বিশাল আস্তানা। এই ক্যাপাসিটি চার্জ কোথায় যায়? ইন্ডিয়ার বিদ্যুৎ যাদের সাথে চুক্তি করেছিল। আমাদের অর্থমন্ত্রী, আর আমরা একসাথেই হলমার্কের বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছি। ক্যাপাসিটি চার্জ বিদ্যুতের এই ব্যাপারে আমরা বক্তব্য রেখেছি। কিন্তু আজকে চার মাস হয়ে গেল, এখনো আমাদেরকে ক্যাপাসিটি চার্জ অর্থাৎ বিদ্যুৎ না পেলেও যাদের সাথে চুক্তি হয়েছে তাদেরকে টাকা দিতে হবে। কত টাকা দিতে হয় সেটা করেছেন। তাই আমার দাবি, এই ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করে দিয়ে আমাদেরকে নতুনভাবে বিদ্যুৎ দিতে হবে। আমি প্রশংসা করি, আপনারা আজকে বিদ্যুতের ব্যাপারে একটা নতুন পদক্ষেপ নিয়েছেন। অবশ্যই সেটা সফল হোক, সেটাই কামনা করি।
তিনি জনপ্রশাসন সর্ম্পকে বলেন, কি হচ্ছে জনপ্রশাসনে? ১৮ বছরের যারা প্রশাসন চালিয়েছেন, যারা সুবিধা পেয়েছেন, পদায়ন পেয়েছেন, ভালো ভালো পোস্ট পেয়েছেন, তাদেরকে কাউকেও সরালেন না। সবাইকে আপনারা বহাল তবিয়তে রেখে দিলেন। আর এখন আপনারা কি করছেন? জনপ্রশাসনে ১৮ বছরে যারা নির্যাতিত, যারা পদায়ন পাস নাই, যারা প্রমোশন পান নাই, তাদেরকে আস্তে আস্তে করে সবাইকে সচিব পদ, জয়েন্ট সেক্রেটারি পদ, এডিশনাল সেক্রেটারি পদ থেকে আস্তে আস্তে বিদায় করে দিচ্ছেন। তাই বলতে চাই এই বাজেট যদি ৩৬শে জুলাইয়ের চেতনার মানুষদেরকে দিয়ে করাতেন, তাহলে সেই বাজেট হতো বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার। এই বাজেট হয়েছে করতান্ত্রিক বাজেট। ১৯৭২ সালের বাজেট, ১৯৭৩ সালের বাজেটÑ দিয়েছিল, সবাই প্রশংসা করেছিল। কিন্তু বাজেট দেওয়ার পর আমরা দেখলাম সেরু মিয়া। অর্থমন্ত্রী ছিল তাজউদ্দীন, আর বাণিজ্য মন্ত্রী ছিল সেরু মিয়া, আমাদের চাক্তাইয়ের শফি সওদাগর। অর্থাৎ ব্ল্যাকে যা মাল আসবে, যদি তাজউদ্দীন সাহেব পারমিশন দিয়েÑ দিয়েছিলেন, সেরু মিয়ার নাম বললেই সব পরিষ্কার, কালোবাজার। তাই আমরা দেখতে পেলাম ৭৪-এর দুর্ভিক্ষ। তাই দেখতে পেলাম মরিচের দাম ১৫০ টাকা, যেটা বিগত ১৮ বছরে এস আলমের মাসুদÑ আপনারা তার কথা বলেন? এস আলমের মাসুদের বিচার আপনারা করতে পারেন নাই। ইসলামী ব্যাংকের ৪৫ হাজার কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গিয়েছে। শেখ হাসিনা আর তার বোন শেখ রেহানা ২ লক্ষ ৬৩ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে, সেগুলোর কথা বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন নাই।
তিনি দুর্নীতি দমন সর্ম্পকে বলেন, আপনি আজকে বাংলাদেশে দুর্নীতি কিভাবে দমন করবেন, সেটার কথা বলেন নাই। কোত্থেকে বলবেন? চার মাসে এখনো পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশন আপনারা প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন না। বরং দুর্নীতিতে যে বাজেট ছিল, এখনো সেটা আপনারা কমিয়ে দিয়েছেন। তাই আপনাদের কাছে অনুরোধ করব, আসুন দেশ এবং জাতির স্বার্থে আমরা নতুন যেই যাত্রা শুরু করেছি, বাজেটের মধ্যে আমি যেই ৯টা মন্ত্রণালয়ের কথা বলেছি, সেই মন্ত্রণালয়ে বাজেট বৃদ্ধি করার জন্য সেই ব্যাপারে চিন্তা করার জন্য।
তিনি আইন-শৃঙ্খলা সর্ম্পকে বলেন, পুলিশের মধ্যে এখনো পর্যন্ত আপনারা ১৪,০০০ শূন্য পদে পুলিশ দেওয়ার কথা বলেছেন। ফ্যাসিষ্ট, স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমলে যেই পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের ব্যাপারে কোনো তদন্ত হচ্ছে না। চার মাসে ১৮ বছরে যেই দুর্নীতি হয়েছে, সেটার শ্বেতপত্র আপনারা প্রকাশ করছেন না। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর, এতদিনের বন্দর এখনো পর্যন্ত বড় ভেসেলগুলো ঢুকতে পারে না। বড় ভেসেলগুলো বাইরে থাকে, সেই ভেসেল থেকে জাহাজ দিয়ে মাল এনে এখনো পর্যন্ত মান্ধাতার আমলের বন্দর পরিচালিত করা হচ্ছে। তাই আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন করতে হবে, সিঙ্গাপুরের আদলে করতে হবে। আমাদের চট্টগ্রামকে আমাদের সাবেক তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা করেছিল। বাণিজ্যিক রাজধানী করার জন্য যা করা দরকারÑ বা করতে হবে।